এর আগে ৩২ বার স্থগিত হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী পুরীর রথযাত্রা

0
404

প্রচীন কাল থেকেই রথযাত্রা উৎসব হয়ে আসছে পুরীতে। ‘রথ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষ, যুদ্ধযান বা কোনোপ্রকার যানবাহন অথবা চাকাযুক্ত ঘোড়ায় টানা হালকা যাত্রীবাহী গাড়ি। পৌরাণিক কাহিনীতে রথের ব্যবহার দেখা যায় যুদ্ধক্ষেত্রে। মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সেনানায়করা রথে চড়ে নিজেরা যুদ্ধ করেছেন এবং সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করেছেন। কিন্তু সনাতন ধর্মে রথের অর্থ ভিন্ন। একাংশের মতে রথ একটি কাঠের তৈরি যান বা শকট, যাতে চড়ে স্বয়ং ভগবান এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন। ভগবানের এই রথারোহণই ‘রথ যাত্রা’ নামে পরিচিত। ওডিশার সৈকত শহর পুরীতে শ্রী জগন্নাথ ধামের রথযাত্রা জগৎ বিখ্যাত। অনেক ঝড়ঝাপটা কাটিয়েও এই রথের রশিতে টান পড়ে প্রতিবছর। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে পুরীর রথ সাতশো বছরের বেশি পুরোনো। আবার মতভেদে এই রথযাত্রা শুরু হয়েছিল পাঁচ হাজার বছর আগে। এবারই প্রথম করোনা আবহে ভক্ত সমাগম ছাড়াই হচ্ছে পুরীর রথযাত্রা। তবে এই প্রাচীন রথের চাকা এর আগে থমকেছিল মোট ৩২ বার। ১৫৬৮ সাল থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বন্ধ রাখতে হযেছিল এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা। ইতিহাসের নথি অনুযায়ী এই সময়কালে ভারতে ইসলামিক শাসন ছিল। ফলে ইসলামিক শাসকদের হানা ও অত্যাচারের জন্যই জগন্নাথের বিগ্রহ লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল বলে জানা যায়। বাংলার সুলতান সুলেইমান কিররানির জেনারেল কালা পাহাড়ের হামলায় পুরীতে। ফলে তাঁর হাত থেকে জগন্নাথ বিগ্রহকে বাঁচাতে ১৫৬৮ থেকে ১৫৭৭ সাল পর্যন্ত টানা ৯ বছর বন্ধ রাখতে হয়েছিল পুরীর রথযাত্রা। এরপর ১৬০১, ১৬০৭, ১৬১১, ১৬১৭, ১৬২১-২২ সালে হামলার আশঙ্কায় বন্ধ ছিল পুরীর রথ। একইভাবে ওড়িশার মুঘল সুবেদার একরম খানের হামলা থেকে বিগ্রহকে বাঁচাতে ১৬৯২ সাল থেকে টানা ১৩ বছর বন্ধ ছিল পুরীর রথযাত্রা। এরপর ১৭৩১ ও ১৭৩৩ থেকে ১৭৩৫ সাল পর্যন্ত বারেবারে ওড়িশার ডেপুটি গভর্নর মহম্মদ তাকি খান পুরীর মন্দিরে হামলা চালিয়েছিল। ফলে ওই সময়কালেও পুরীর রথযাত্রা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে এরপর থেকে আর কখনও পুরীর রথের চাকা থমকায়নি।

পুরীর রথের বর্ননা ও ইতিহাস-

পুরীতে যে  রথযাত্রা উৎসব হয় তাতে থাকে তিনটি রথ।  একটিতে শ্রী জগন্নাথ, একটিতে বলরাম এবং আরেকটিতে থাকেন সুভদ্রা। একেকটি রথের একেক নাম। যেমন, জগন্নাথের রথটির নাম নন্দিঘোষ। রথের সারথির নাম হল দারুকা। এর উচ্চতা ৪৪ ফুট ২ ইঞ্চি। এই রথের ১৬টি চাকা, প্রত্যেক চাকার পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। চারটি ঘোড়া এই রথ টানে, যাদের নাম শঙ্খ, বলাহক, শ্বেতা এবং হরিদশ্ব। বলভদ্রের রথের নাম তালধ্বজ, সারথির নাম মাতলি।। যার উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। এই রথের চাকা ১৪টি, প্রত্যেকটির পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। এই রথও চারটি ঘোড়া টানে, যাদের নাম ত্রিব্রা,  ঘোরা, দীর্ঘশর্মা  এবং স্বর্ণাভা। সুভদ্রার রথের নাম দেবদলন, রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। সুভদ্রার সারথির নাম অর্জুন। এর ১২টি চাকা যার পরিধি ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। সুভদ্রার রথের চারটি ঘোড়ার নাম রোচিকা, মোচিকা, জিতা এবং অপরাজিতা। তিনটি রথের রশির নামও আলাদা। যেমন, জগন্নাথের রথের রশির নাম শঙ্খচূড়, বলভদ্রের বাসুকিনাগ এবং সুভদ্রার রথের রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগিনী। ওড়িশার প্রাচীন পুঁথি ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ অনুযায়ী এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সেই সত্যযুগে। সে সময় ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের সূর্যবংশীয় পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণুর জগন্নাথরূপী মূর্তি নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময় তিনি রথযাত্রারও স্বপ্নাদেশ পান। মূলত তাঁর হাত ধরেই পুরীতে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন শুরু হয় বলে প্রচলিত।

SHARE