গড়বেতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়

0
153

প্রাচীন ঐতিহ্য ও ইতিহাস রয়েছে। রয়েছে মন মাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও। তবু রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে আজও ব্রাত্য গড়বেতা। বহু প্রাচীন ইতিহাস বহন করছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এই জনপদ। ৫০০ বছরের পুরোনো গড় বা কেল্লার সামান্য নিদর্শন রয়ে গিয়েছে আজও। শিলাবতী নদীর তীরের এই শহরে ঘুরে দেখার বহু জায়গা রয়েছে। গড়বেতার কাছেই রয়েছে বাংলার ‘গ্রান্ড ক্যানিয়ন’ গনগনি। শিলীবতী বা শিলাই নদীর তীরে লাল, গেরুয়া মাটির পাহাড়ে আশ্চর্য সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য দেখতে হলে আসতেই হবে এখানে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় গনগনির রূপ সবচেয়ে সুন্দর। ফটোগ্রাফির আদর্শ পরিবেশ।

ছবি: গনগনির আপার সৌন্দর্য….

 

গড়বেতা কি সত্যই বকরাক্ষসের দেশ?

লোকশ্রুতি, পাণ্ডবরা জতুগৃহ থেকে প্রাণ রক্ষা পেয়ে এই অঞ্চলে কিছুকাল ছদ্মবেশে বাস করেছিলেন। কথিত আছে তাঁদের অবস্থিত নগরটি একচক্রনগর বর্তমানে এক্যেড়া গ্রাম। তাঁরা যে গ্রামে ভিক্ষা করতেন, সেটি বর্তমানে ভিখনগর নামে পরিচিত। এখান থেকেই পাঞ্চালরাজকুমারী দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় গিয়ে লক্ষ্যভেদ করে পাঞ্চাল রাজকন্যাকে লাভ করেছিলেন। পাণ্ডবরা একচক্রনগরীতে অবস্থান কালে বকরাক্ষস নামে এক প্রকান্ড রাক্ষসকে মহাবলী ভীম যে স্থানে হত্যা করেছিলেন সেই স্থান হল গড়বেতার গণগণির খুলা।

শিলাবতী নদী…

মহাভারতের যুগের বকরাক্ষসের হাড় এখনও নাকি গণগণির খুলায় পাওয়া যায়। কিছুকাল পূর্বেও গড়বেতার গণগণির খুলায় সাধারণ পাথরের থেকেও ভারী একধরণের পাথর পাওয়া যেত। সেগুলি বকরাক্ষসের হাড় নামেই বিখ্যাত ছিল। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, একদিন যুধিষ্ঠির নদীর পাড়ে এক ব্রাহ্মণকে বসে কাঁদতে দেখেন। যুষ্ঠির তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নদীর ওই পাড়ে এক রাক্ষস আছে, নাম বক। সে প্রতিদিন একজন করে গ্রামের মানুষকে আহার হিসাবে গ্রহণ করে। আজ তাঁর পালা। যুধিষ্ঠির এই কথা শুনে রেগে যান এবং রাক্ষসকে বধ করার জন্য ভীমকে পাঠান। প্রবল যুদ্ধ হয় বকরাক্ষস ও ভীমের মধ্যে। এই যুদ্ধের ফলেই এই গনগনির ক্যানিয়নের সৃষ্টি হয়।

গড়বেতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী

গড়বেতা বললেই প্রথমে আসে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের কথা। গড়বেতার অধীষ্টাত্রী দেবী শ্রী শ্রী সর্বমঙ্গলা মাতা ঠাকুরানীর মন্দির। যা ১০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। সাধারণত হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরের মুখ হয় দক্ষিণে। তবে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মুখ উত্তর দিকে। কথিত আছে, মহারাজ বিক্রমাদিত্য সর্বমঙ্গলা মায়ের সামনে তপস্যায় বসেন। তাঁর তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে দেবী তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে দেন। সত্যিই কী বিক্রমাদিত্য সেই ক্ষমতা লাভ করতে পেরেছেন। কী ভাবে পরীক্ষা করবেন? প্রথমেই তাই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী তাল বেতালকে দিয়ে তা পরীক্ষা শুরু করেন। তাল বেতালকে নির্দেশ দেন মন্দিরের মুখ দক্ষিণ থেকে উত্তরে করতে। সঙ্গে সঙ্গে তাল বেতাল মন্দিরের মুখ পরিবর্তন করে দেন। সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পাশাপাশি এখানে রয়েছে ১২টি শিবের মন্দিরও।

গড়বেতার অধীষ্টাত্রী দেবী শ্রী শ্রী সর্বমঙ্গলা মাতা ঠাকুরানী…

 

এখান থেকে কিছুটা এগোলেই রয়েছে বগড়ি কৃষ্ণ জিউ। যে মন্দির সম্পর্কেও রয়েছে নানা রূপকথা। তবে সংস্কারের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে মন্দিরের কারুকার্য। কথিত আছে বেতালের নাম অনুসারে এই জায়গার নাম নামটি বেতা দেওয়া হয়েছিল। গুপ্ত যুগে কুমার গুপ্তের রাজত্বকালে তাঁর সৌজন্যে বেত্র বর্মা এই নগরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সম্ভবত বেত্র বর্মা শহর রক্ষা করার জন্য একটি দুর্গ বা গড় নির্মাণ করেন। সম্ভবত প্রথম দিকে শহরটির নাম ছিল বেত্র-গড়। বেত্র-গড় শব্দটি সময়ের মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে গড়-বেত্রা ও পরে গড়বেতা হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করতে স্বয়ং বিশ্বকর্মা দেব আসেন সাধুর বেশ ধরণ করে। তিনি রাজাকে কথা দেন এক রাতের মধ্যে তিনি মন্দিরটি নির্মাণ করবেন। হঠাৎ একটি কাক/ককিল ভোর রাতেই কলরব শুরু করে দেয়। তখন ঐ সাধু তাকে পাশানে পরিনত করেন। যেটি এখনও এখানে এলে দেখা যায়।

ছবি: সর্বমঙ্গলা মন্দির…