ব্রেকিং নিউজ
kazi-nazrul-islam-and-his-Contribution-in-shyamasangeet
Kazi Nazrul: শুধুই বিদ্রোহের কবিতা নয়, শ্যামাসঙ্গীতেও অপার ভূমিকা কাজি নজরুলের

Post By : সিএন ওয়েবডেস্ক
Posted on :2022-05-24 16:15:29


অমৃত হালদার: 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন', 'শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধুপকাঠিতে', 'শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা'। কালীপুজোর সময় এখনও যে গানগুলি বেজে চলে পাড়ার মণ্ডপ থেকে মন্দিরে মন্দিরে। ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে চারদিক। একজন 'অহিন্দু', বলা ভালো অসাম্প্রদায়িক মানুষের লেখা শ্যামাসঙ্গীতে এখনও বুঁদ হয়ে থাকে মানুষ। ধর্মান্ধতা ভুলে, ভিন ধর্মের আরাধ্যা দেবীর আরাধনা সঙ্গীত বেরিয়ে এসেছিল বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের হাত দিয়ে।

ভাবতে বেশ অবাক লাগলেও, এটাই সত্যি। বাংলার সাহিত্যরসিকদের কাছে তিনি পরিচিত কাজি নজরুল ইসলাম হিসেবে। অনেকেই ভাবতে পারেন যে বিদ্রোহী কবির এ হেন ইচ্ছা হল কেন? তিনি ইসলামি সংগীত, গজল ছেড়ে হঠাৎ কালীকীর্তন বা শ্যামাসঙ্গীত লিখতে গেলেন কেন?

হালিশহরের সাধক তথা কবি রামপ্রসাদ সেনের পরে নজরুলই একমাত্র কবি, যিনি প্রায় ২৪৭টির মতো শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছেন। অন্য এক সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও হিন্দুর আরাধ্যা একজন দেবীর গুণকীর্তণ করার জন্য কেন তিনি এত গান রচনা করলেন, জানতে কৌতূহল হয়। প্রতিটি গানের কী অসাধারণ শব্দবিন্যাস। 'ভক্তি আমার ধুপের মত উর্দ্ধে ওঠে অবিরত' বা 'মার হাসি মুখ চিত্তে ভাসে চন্দ্রসম নীলাকাশে'। এই গানেরই আরও কয়েকটা লাইনের উল্লেখ করলে কাজি সাহেবের লেখনীর মধ্যে ভক্তিভাবের আভাস পাওয়া যাবে।  'অন্তরলোক শুদ্ধ হল পবিত্র সেই ধুপসুবাসে (ইসলাম ধর্মে একমাত্র মৃত্যুর পরেই ধুপের ব্যবহার করা হয়)/সব কিছু মোর পুড়ে কবে চিরতরে ভষ্ম হবে, মার ললাটে আঁকব তিলক সেই ভষ্মবিভূতিতে'। শোনা যায়, তিনি ছিলেন কালীভক্ত।  পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা নজরুলকে আরও বেশি কালীনির্ভর করে তুলেছিল। স্ত্রী প্রমীলা কাজির স্থায়ী আরোগ্য এবং পুত্র বুলবুলের মুত্যু তাঁর মনকে আরও দুর্বল করে তোলে। মুর্শিদাবাদে লালগোলা বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার বরদাচরণ মজুমদার ছিলেন তন্ত্রসাধক। তিনিও ছিলেন কালীভক্ত। তাঁর যোগবলে তিনি কাজি সাহেবের মৃত ছেলে বুলবুলকে দেখাতে পারবেন, এই কথা শোনার পরে নজরুল তাঁর কাছে দীক্ষা নেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কালীসাধনা করতেন। বিষয়টির মধ্যে কোনও হ্যালুশিনেসন ছিলে কিনা, তা জানা যায়নি। স্ত্রীর শারীরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি কোথায় না গিয়েছেন? পীরের দরগা থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেছেন, বিভিন্ন মন্দির থেকেও দৈব ওষুধ নিয়ে আসতেন। সেই কারণে একবার তিনি বিশিষ্ট কথা-সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (তারাশঙ্করও ছিলেন তন্ত্রসাধক) কাছে গিয়েও ওষুধ নিয়ে আসেন।

কালীভক্ত এবং সাধক হওয়ার জন্য নজরুল বামাক্ষ্যাপার কাছেও গিয়েছিলেন।  তবে শ্যামা মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও নির্ভরশীলতা না থাকলে কিন্তু শুধুমাত্র বাহ্যিক ঘটনার প্রভাবে এমন আত্মনিবেদনের গান লেখা সহজ নয়। শ্যামাসঙ্গীতের যে দর্শন, তা তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। শুধু গান লিখেই থেমে থাকেননি। সেই সব গানে সুরারোপও করেছেন। 'শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা' গানটিতে কাজি সাহেব মালকোষ রাগাশ্রীত সুর করেছিলেন। কী অদ্ভুত দর্শন গানের প্রতিটি ছত্রে। 'জ্বলিয়া মরিবি কে সংসার জ্বালায়, তাহারে ডাকিছে মা কোলে আয়, কোলে আয়, জীবনে শ্রান্ত ওরে ঘুম পাড়াইতে তোরে, কোলে তুলে নেয় মা মরণেরও ছলে।'

তাঁর সৃষ্টিতে তিনি দেবী কালিকাকে তিনরকমভাবে দেখেছিলেন। কন্যারূপে, মাতৃরূপে এবং অশুভনাশিনীরূপে। 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন' গানটিতে শ্যামার কন্যারূপকেই প্রত্যয় করা যাবে। এই গানেরও একটি লাইনের উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে। 'পাগলী মেয়ে এলোকেশী নীশিথিনির দুলিয়ে কেশ, নেচে বেড়ায় দিনের চিতায় লীলার যে তার নাইকো শেষ।/সিন্ধুতে মার বিন্দুখানিক ঠিকরে পড়ে রূপের মানিক, বিশ্বে মায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগবসন'। এই গানে কাজি সাহেব শ্যামা মায়ের কন্যা এবং মাতৃরূপকেই প্রকাশ করেছেন। তাঁর চেতনায় মাকে শুধুমাত্র দর্শন আর তত্ত্বের মধ্যে আটকে না রেখে করে তুলেছেন ঘরের মেয়ে। পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা আর অপার কালীভক্তি যে বিদ্রোহীকবিকে কখন কালীসাধকে পরিণত করেছিল, তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতে পারেননি। অবশ্য এই সব প্রসঙ্গ কি ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে উৎসাহী কিছু মানুষ প্রকাশ করেছিলেন না বাস্তবে ঘটেছিল সেই বিষয়ে কিছু বিতর্ক রয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামী সংগীত রচনার পাশাপাশি একাধিক বৈষ্ণবকীর্তণ, গজল, শ্যামাসংগীত যে রচনা করেছিলেন তা নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকার কথা নয়। সেই সব শ্যামাসঙ্গীত যে অত্যন্ত উঁচু দরের এবং উৎকৃষ্ট, সে বিষয়ও কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।






All rights reserved © 2021 Calcutta News   Home | About | Career | Contact Us

এই সংক্রান্ত আরও পড়ুন