সান্দাকফু অভিযান (পর্ব-২)

0
120
Sandakphu CN

আরে! তাড়াতাড়ি ওঠ, একবার দেখ বাইরেটা। সাত সকালেই বন্ধুর ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। রাতে থুড়ি সন্ধ্যায় ৭টায় রাতের খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দুটো লেপ গায়ে দিয়েও মনে হচ্ছিল যেন জলের মধ্যে শুয়ে, সেকি ঠান্ডা! এরমধ্যেই ভোর সাড়ে পাঁচটায় বন্ধুদের হাঁকাহাঁকিতে ঘুমের দফারফা হল। তবে কষ্টের ফল যে মিঠা হয় তার প্রমানও মিলল হাতেনাতে। তাড়াতাড়ি করে গায়ে কটস উলের জ্যাকেট ও মাথায় মাফলার ও টুপি হাতে গ্লাভস পরে পায়ে মোজা-জুতো পড়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম সেটা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রঙের খেলায় মেতেছে মাউন্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা।

অপূর্ব শোভা কাঞ্চনজঙ্ঘার, দিনের প্রথম সূর্যের আলোয় মায়াবী রঙে যেন ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদল করছে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্ঘটি। আমাদের ট্রেকার্স হাটের রান্নাঘর থেকে এক কাপ গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে সেই শোভা দেখলাম আমরা। বেশ খানিকক্ষণ পরই তাড়া লাগলো ব্যাগ গুছিয়ে বের হওয়ার জন্য। গতকালই আমরা এসেছিলাম টুংলুতে। এবার আমাদের গন্তব্য ‘সান্দাকফু’। মানেভঞ্জন থেকে আমাদের বুক করা ল্যান্ডরোভার এসে গেছে, চটজলদি রেডি হয়ে তাতেই চড়ে বসলাম। একটা আলাদাই অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে চললাম। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে রাস্তা, বেশ কিছুটা রাস্তা কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো। তারপরই পাথর-নুড়ি মিশ্রিত রাস্তা। ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি উপরে উঠতে লাগল। প্রায় ঘন্টা খানেক পর আমরা এসে পৌঁছলাম গারিবাস। এই গারিবাসে পৌঁছনোর কিছুটা আগে গাড়িতে একটি খাড়া ঢাল দিয়ে নীচে নামতে বেশ লাগলো। গারিবাস পৌঁছে স্থানীয় দোকান থেকে চা, কফি, মোমো, ডিমের পোচ দিয়ে প্রাত:রাশ সেরে নিলাম। সেখানেই দেখলাম সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-এর একটি ব্যাটালিয়ন। যদিও ফটো তোলা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ এখানে।

Sandakphu CN

বাকি রাস্তায় বহু জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে অনেক ফটো তুললাম। মজার বিষয় হল, আমরা যে কতবার ভারত-নেপাল বর্ডার পার করেছি সেটা গুনতে পারিনি। এরপর হঠাৎ করেই কিছু উপরে উঠে এসে দেখতে পেলাম একটি অপরূপ লেক। গাইড জানালেন এটাই কালিপোখরি লেক। স্থানীয় বাসিন্দারা এই লেকটি পবিত্র বলে মনে করেন। এখানেই তাঁরা বিভিন্ন ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করেন। কয়েকটি ছবি তুলে ফের এগিয়ে চললাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সান্দাকফু। যা কিনা পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ স্থান। এখানেও ঠান্ডা ব্যপক, তবে টুংলুর মতো নয়। আমরা গাড়ি থেকে নেমে যে যার ব্যাগ পিঠে নিয়ে ট্রেকার্স হাটে সেঁদিয়ে গেলাম। যদিও সান্দাকফুতে কয়েকটি বেসরকারি হোটেল রয়েছে। তবে আমরা থাকব পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টেকার্স হাটে, যা আগে থেকেই বুক করা ছিল। এখানে ইলেকট্রিক নেই, সোলার আলোই ভরসা। টেকার্স হাটগুলিও দাঁরুণ, বড় বড় ঘর, বেডও রয়েছে বেশ কয়েকটি। প্রত্যেক বেডেই রয়েছে লেপ ও কম্বল। প্রত্যেক ঘরেই দেওয়া হয় একটি করে জোড়াল টর্চ। বলে রাখি, এখানে খাবার খরচ একটু ব্যয়বহুল। ভাত, ডাল, একটা সবজি, ডিম ভাজা ও আলুভাজা নিয়ে ২৬০ টাকা মতো। তবে পেট ভরেই পাবেন খাবার। বললে জল গরম করে দেবে।


জার্নির ধকলে দুপুরের খাওয়া সেরে বিশ্রাম। যদি চান তবে বিকেলের দিকে একটু ঘুরে দেখতে পারেন পাহাড়ের কোলে ছোট্ট জনপদটি। আমরা গেলাম সানসেট পয়েন্টে। পায়ে হেঁটেই যেতে হয়, তবে কিছুটা উঁচু পাহাড়ে উঠতে হবে। এটাই পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পয়েন্ট। সূয্যিমামা অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নেমে আসলাম নীচে। কারণ ঠান্ডা আরও বেড়ে যাবে এবার। সন্ধ্যেবেলা গল্পগুজব করেই কাটিয়ে জলদি রাতের খাওয়া শেষ করে লেপের তলায়। বলে রাখি সান্দাকফু ট্রেকিংয়ের জন্য দারুণ জায়গা। এখান থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেকিং রুট রয়েছে। সান্দাকফু থেকে ফালুট ২১ কিমি ট্রেকিং। তবে মানসিক ও শারীরিক শক্তি প্রয়োজন এই পথে হাঁটতে হলে। সান্দাকফুর আশেপাশে কয়েকটি ঘোরার জায়গা রয়েছে। ঘুরে দেখে নিয়ে পরদিন নেমে এলাম নীচে। সান্দাকফু থেকেই সোজা নিউ জলপাইগুড়ি ফেরা যায়। তবে আমরা মানেভঞ্জন হয়েই ফিরলাম।

কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য- সঙ্গে কম ব্যাগ রাখুন, কারণ এগুলি নিজেদেরই বহন করতে হবে। ভারী শীতবস্ত্র সঙ্গে রাখুন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধগুলি নিতে ভুলবেন না। এছাড়া শুকনো খাবার সঙ্গে রাখুন, কারণ রাস্তায় বেশি দোকান নেই, থাকলেও দাম অনেক বেশি।