বরুফে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাইনের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে হিমেল পরশ অনুভব করেছেন কখনও? তাহলে মহান রঙ্গশালায় সন্তুর ঠিক কী, তা আন্দাজ করতে পারবেন বইকি। ১০০ খানা তারের উপর ছোট্ট দুখানা হাতুড়ির মখমলি আনাগোণা। সুর তো নয়, যেন একটা স্বর্গীয় অনুভূতি। সন্তুরের চিকন সুরের মূর্ছনায় যিনি ডুব দিয়েছেন, তিনিই শুধু জানেন এর গভীরতা। আর সন্তুরকে সর্বোচ্চস্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা।
জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি, কাশ্মীরে। নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মাখামাখি করে থাকা জল-আলো-বাতাস গায়ে মেখে বড় হয়ে ওঠা। কাশ্মীরের একটা বিশেষ বিষয় হল-এই অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আদানপ্রদানের সংযোগস্থল। তাই কাশ্মীরে বহু সভ্যতার প্রভাব বিশেষভাবে নজর করা যায়। সেই ধারা মিশেছে সঙ্গীতেও। সন্তুরও সেই ধারার এক বাহক। ৫ বছর থেকেই ছোট্ট শিবকুমারের বাবার কাছে তবলা শেখা শুরু। তাঁর বাবা ঊমা দত্ত শর্মা ছিলেন বিখ্যাত গায়ক তথা তবলাবাদক। তবে সেই ধারায় না গিয়ে মাত্র ১৩ বছর থেকে শিবকুমার ঠিক করেছিলেন, তিনি সন্তুর বাজাবেন। একটা লোকজ যন্ত্রের সুরকে অঞ্চলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবেন। ছোট্টবেলায় দেখা সেই স্বপ্নখানা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা দেখেছে গোটা পৃথিবী। তবে এই সাফল্যের পিছনে ছিল বিরাট সুরসাধনা, কঠোর অধ্যাবসায়।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সন্তুর তথা শত-তন্ত্রী বীণার আগমন পণ্ডিত শিবকুমারের হাত ধরেই। একটা লোকজ বাদ্যযন্ত্রকে শাস্ত্রীয় ঘরানার এক সদস্য করে তুলতে শিবকুমারজিকে কম কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি। সুফি ঘরানার বাইরে গিয়ে নিজস্বতা ভেঙেচুড়ে এক অন্য ধারা তৈরি করলেন পণ্ডিতজি। ধীরে ধীরে কঠিন বাধার পাহাড়গুলো সামনে থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করল। উপত্যকার গণ্ডি পেরিয়ে শিবকুমারের সন্তুরের সুর ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। সন্তুরের জায়গা হল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে।
১৯৫৫ সালে মুম্বইয়ে প্রথম মঞ্চে সন্তুর বাজান তিনি। ১৯৬০ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম সোলো অ্যালবাম। তারপর আর কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক কালজয়ী শো করে মাতিয়ে রেখেছেন আসমুদ্র হিমাচল। পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা আর বিখ্যাত বাঁশিবাদক হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার জুটি তো সুর ও সঙ্গীতের জগতে কিংবদন্তী হয়ে গিয়েছে।
তবে শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি তিনি। ‘ডর’, ‘চাঁদনি’, ‘লমহে’র মতো বলিউডের মূল ধারার ছবিতে কালজয়ী সুরসৃষ্টি করেছেন। তাঁর সুর দেওয়া ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম ‘সিলসিলা’।
৬ মাস ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। নিয়মিত ডায়ালিসিস চলত তাঁর। মঙ্গলবার মুম্বইয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শিল্পী। থামল সন্তুর। একমাথা ঝাঁকরা রেশম চুলওয়ালা সুদর্শন মানুষখানা আর নেই। পাড়ি দিয়েছেন অমৃতলোকে। তবে রয়ে গেল কিংবদন্তী শিল্পীর সৃষ্টির অপার ভাণ্ডার।