বাংলাদেশের পাহাড়ি কন্যা ‘বান্দরবন’

0

Summary

একসময় বাংলাদেশ অবিভক্ত বাংলার অঙ্গ ছিল। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার সময় দেশভাগে বাংলার পূর্ব অংশটি চলে যায় পাকিস্তানের দখলে। নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। পরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্যেই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। তাই পশ্চিমবঙ্গের লাগোয়া এই দেশকে আজও বলা হয় পূর্ববঙ্গ। ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, কলা, আচার, অনুষ্ঠানে কোনও বিভেদ নেই দুই বাংলার। তাই এবার বলি ওপার বাংলার ভ্রমণ গল্প। আজ জানাব বান্দরবনের ভ্রমণ তথ্য।

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র হল নীলগিরি। রাজধানী শহর ঢাকা থেকে নীলগিরির দূরত্ব ৩৭৫ কিলোমিটার। আরেক গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম থেকে দূরত্ব ৯২ কিলোমিটার। বান্দরবন শহরটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বান্দরবন জেলার থানছি উপজেলায় অবস্থিত। বান্দরবন পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষেই রয়েছে। তাই দেশ বিদেশ থেকে প্রতিদিনই হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় মুখরিত হয় বান্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলি। ৪৪৭৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের ডালি সাজিয়ে পর্যটকদের অপেক্ষায় রয়েছে বান্দরবন।

অবারিত সবুজের সমারোহ মেঘকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে থাকলে চলে আসুন বাংলাদেশের এই অঞ্চলে। বান্দরবনে ঘুরে দেখার জায়গাও অনেক, যেমন নীলগিরি, স্বর্ণমন্দির, মেঘলা, শৈল প্রপাত, নীলাচল, মিলনছড়ি, চিম্বুক, সাঙ্গু নদী, তাজিনডং, কেওক্রাডং, জাদিপাই ঝরণা, বগালেক, মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্স, প্রান্তিক লেক, ঋজুক জলপ্রপাত, নাফাখুম জলপ্রপাত, এছাড়া বান্দরবানে কয়েকটি ঝিরি রয়েছে। যেমন, চিংড়িঝিরি, পাতাং ঝিরি, রুমানাপাড়া ঝিরি। এতগুলো জায়গা একসঙ্গে দেখা সম্ভব নয়। তাই ঘুরে দেখতে পারেন আশেপাশের সাতটি দর্শনীয় স্থান। সেগুলি হল স্বর্ণমন্দির, নীলগিরি, মেঘলা, নীলাচল, শৈলপ্রপাত, মিলনছড়ি ও চিম্বুক।

নীলগিরি-

নীলগিরি হল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটন কেন্দ্র। উচ্চতা প্রায় তিন হাজার ফুট। বান্দরবনের সবচেয়ে সুন্দর ও আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র এটি। বাংসাদেশের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত। তাই  চট্টগ্রাম থেকে একদিনেই নীলগিরি ঘুরে ফিরে আসা যায়। বর্ষা বাদে অন্যান্য সময়ে এই নীলগিরি থেকে সূর্যদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতিই আলাদা। বান্দরবন জীপ স্ট্যান্ড থেকে জিপ, ল্যান্ডরোভার সহ হালকা গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। এছাড়া নিরিবিলিতে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য আদর্শ জায়গা হল নীলগিরি। শান্ত নির্জন পরিবেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নীলগিরিকে পর্যটকদের কাছে ব্যপক জনপ্রিয় করেছে।

স্বর্ণমন্দির-

বান্দরবনের আরেক জনপ্রিয় পর্যটনস্থান হল স্বর্ণমন্দির। এটি বান্দরবন জেলার বালাঘাটা উপজেলার পুল পাড়ায় অবস্থিত। এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা মন্দির বা প্যাগোডা। যার প্রকৃত নাম ‘মহাসুখ প্রার্থনা পূরক বৌদ্ধধাতু চৈত্য’। তবে বাংলাদেশে এটি স্বর্ণমন্দির নামেই পরিচিত। বান্দারবন জেলাসদর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরেই এই স্বর্ণমন্দির। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই বৌদ্ধ প্যাগোডাটির রঙ সোনালি। তাই এর নাম স্বর্ণমন্দির। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র স্থান হওয়ায় দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ এখানে আসেন। কথিত আছে এটি গৌতম বুদ্ধের সময়কালেই নির্মিত। বিশ্বের সেরা কয়েকটি প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে এখানে। অসাধারণ নৈস্বর্গিক পরিবেশে এই প্যাগোডাটি ঠিক যেন পিকচার পার্ফেক্ট। প্রতিবছর এখানে মেলা বসে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথটিও বেশ মনোরম। এই স্বর্ণমন্দির ছাড়াও আশেপাশে দেখে নিতে পারেন বান্দরবন রেডিও স্টেশন।

মেঘলা-

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা পরিষদের অন্তর্গত মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ে বাঁধ দিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয়। বান্দরবন জেলা সদর থেকে দূরত্ব মাত্র চার কিমি। পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে নানান বিনোদনের ব্যবস্থা। কৃত্রিম জলাশয়ে চিত্ত বিনোদনের জন্য রয়েছে নৌকা বিহারের ব্যবস্থা, ঝুলন্ত সেতু। এছাডা়ও রয়েছে শিশুদের জন্য মনোরম পার্ক এবং চিড়িয়াখানা। মেঘলায় রয়েছে দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ, এগুলি দিয়ে যাতায়াত করা যায়। প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা জনপ্রতি। পাশাপাশি সাময়িক বিশ্রাম ও খাওয়াদাওয়ার জন্য নানান ব্যবস্থা রয়েছে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে। নিরিবিলিতে স্বপরিবারে বেড়ানোর জন্য একটি আদর্শ জায়গা হল মেঘলা।

 

নীলাচল এবং শুভ্রনীলা-

বান্দরবন জেলা সদরের কাছেই টাইগারপাড়ার আশেপাশে এই দুটি পর্যটন কেন্দ্র অবস্থিত। নীলাচলের উচ্চতা প্রায় ১৭০০ ফুট। এখানকার পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি সত্যই অসাধারণ। নীলাচল জেলা প্রশাসন ও শুভ্রনীলা বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ দুটি পর্যটন কেন্দ্রটি পরিচালিত হয়। প্রকৃতির কোলে নিভৃতে দু-এক দিন কাটাতে হলে এখানে আসাই যায়।

 

চিম্বুক-

চিম্বুক হল বাংলাদেশের তৃতীয় উচ্চতম অঞ্চল। বান্দরবন জেলা সদর থেকে ২৬ কিমি দূরে অবস্থিত। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ২৫০০ ফুটের কাছাকাছি। চিম্বুক যাওয়ার পথে রাস্তায় পড়বে সাঙ্গু নদী। পথের সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবে না। চিম্বুকে পৌঁছে মনে হবে যেন মেঘগুলিকে হাতে ছোঁয়া যাবে। উঁচু পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত মেঘরাশি পায়ের অনেক নীচ দিয়ে ভেসে চলেছে।

এখান থেকেই দেখা যায় দূরের কক্সবাজার আর চট্টগ্রাম জেলার একাংশ। ভরা বর্ষায় চিম্বুক আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক পথে যেতে যেতে মনে হবে যেন প্রকৃতই স্বর্গ রাজ্য দিয়ে চলেছেন। চিম্বুক বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম একটা নাম। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় এখানে সেভাবে হোটেল বা রেস্তরাঁ গড়ে ওঠেনি। বান্দরবন জেলা সদর থেকে চাঁদের গাড়ি (জিপ বা ল্যান্ডরোভার) ভাড়া করেই যাওয়া যায় চিম্বুক। সঙ্গে করে হালকা খাবার ও জল নিয়ে যেতে ভুলবেন না।

শৈলপ্রপাত-

বান্দরবন জেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিমি দূরেই রয়েছে সুন্দর এই জলপ্রপাত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও এই এলাকা অসাধারণ। প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি এই শৈলপ্রপাত। উঁচু পাহাড় থেকে ধাপে ধাপে সারাক্ষণই নেমে আসছে স্বচ্ছ শীতল জল। এই ঝর্ণার জল একেবারেই কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তবে বর্ষাকালে এই পাহাড়ি ঝর্ণাই হয়ে ওঠে তেজি জলপ্রপাত। রাস্তার পাশেই এই ঝর্না হওয়ায় এখানে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া যায়। তবে এই অঞ্চলে স্থানীয় বম জনজাতির বাস রয়েছে। তাঁদের আদিম জীবনযাত্রাও দেখার মতো।

মিলনছড়ি-

বান্দরবন শহর থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে মিলনছড়ি। শৈলপ্রপাত ও চিম্বুক যাওয়ার পথেই পড়ে এই পর্যটন কেন্দ্র। সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে সাঙ্গু নদী বয়ে চলেছে এখানে।