সাগরপাড়ের সেই ছেলেটা

0
174

বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে সেই ছবি। সমুদ্রে পাড়ে বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একটি শিশু। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভোরের আলোয় এই ছবি তুলেছিলেন এক তুর্কি ফোটোগ্রাফার। সিরিয়ার উদ্বাস্তু শিশু অ্যালান কুর্দির এই মর্মান্তিক ছবিতে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল গোটা দুনিয়া। সিরিয়া থেকে তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসা হতভাগ্যদের দুর্দশায় সিউড়ে উঠেছিল বিশ্ববিবেক।

তাকে নিয়ে একটা বই লিখেছেন অ্যালানের কাকিমা টিমা কুর্দি। নাম “দ্য বয় অন দ্য বিচ।” পৃথিবীর সব কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা এই ছবির তিনবছর পরে অ্যালানের স্মৃতি এখন অনেকটাই ঝাপসা। ২০১৮ সালে পশ্চিমি দুনিয়া আর উদ্বাস্তুদের সাদরে গ্রহণ করতে পারছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির জন্য সিরিয়ার বাস্তুহারাদের জন্য আমেরিকার দরজা বন্ধ। যারা ভূমধ্য সাগর পেরিয়ে ইউরোপে পা রাখতে পেরেছিলেন, তাঁরা এখন পড়শিদের চরম ঔদাসিন্যের মধ্যে হাউসিং কমপ্লেক্সে গাদাগাদি করে থাকে।

টিনা কুর্দির বইয়ের কাহিনি শুরু হচ্ছে কানাডায়। টিনা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁর ছোট ভাই আবদুল্লার নিরাপদে সমুদ্র পেরোনোর খবরের জন্য। তারই মধ্যে অ্যালানের ওই ছবি। ভাইপোর লাল টি শার্ট আর জিনসের হাফ প্যান্ট দেখে চিনতে পেরেছিলেন টিনা। আগের বছরে তিনিই সেগুলো উপহার দিয়েছিলেন অ্যালানকে। খবরটা সত্যিই ব্রেকিং নিউজ, তাঁর পরিবারকে একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

কুর্দি শুনিয়েছেন দামাস্কাস থেকে কুকুরের মতো পালিয়ে আসার কাহিনি। বিয়ের পর যুদ্ধ তাঁকে নিয়ে আসে কানাডায়। এই কাহিনি আইএস অধিকৃত উত্তর সিরিয়ার গ্রাম থেকে ইস্তানবুলের উদ্বাস্তু শিবির, জুলুমবাজ স্মাগলার আর যন্ত্রণার সাগর পাড়ি দেওয়ার ইতিবৃত্ত। তাঁর পরিবারেক কানাডায় আনার জন্য অসংখ্য দরখাস্ত লেখা, জনে জনে দরবার করার গল্প। ভ্যাঙ্কুভারে বেঁচে যাওয়ার অপরাধ বুকে চেপে নিয়ে ভাইবোনদের তুরস্কের ঘেটোতে কষ্ট পাওয়ার স্মৃতিচিত্র।

আর সহ্য করতে না পেরে টিনা তাঁর ভাইকে ৫ হাজার ডলার পাঠান স্মাগলারদের দিয়ে যাতে তারা বেআইনিভাবে সমুদ্র পেরোতে পারে। তুরস্কের সৈকতে অন্ধকারে আবদুল্লা তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে চেপে বসেন অনিশ্চিতের ডিঙিতে। শেষপর্যন্ত বেঁচে থেকে পায়ের তলায় মাটি পেয়েছিলেন একমাত্র আবদুল্লাই।

অ্যালান তার মা রেহান্না আর বড়ভাই গালিবের সঙ্গেই ডুবে গিয়েছিল। টিনা লিখেছেন বুকভাঙা সেইসব কথা। তাঁর বিশ্বাস, একদিন ঠিকই সিরিয়ার ঘরছাড়া মানুষজন ঠাঁই খুঁজে পাবে। সবারই নতুন করে ঘর বাঁধার অধিকার আছে। টিনা শুনিয়েছেন একটি আরবি প্রবাদের কথা, যে গাছকে বারবার উপড়ে ফেলে ফের বসানো হয়, সে গাছ বাড়ে না।

তাঁর একান্ত প্রার্থনা, মানুষের ক্ষেত্রে সেটা যেন না হয়।