রিফাতের ব্যাট

0
21

অশান্তি লেগেই আছে শ্রীনগরের নারওয়ারায়। গোটা কাশ্মীর উপত্যকায় যেসব জয়গায় প্রায়ই গোলমাল লেগে থাকে নারওয়ারা তেমনই এক জায়গা। কথায় কথায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাশ্মীরীদের পাথর বৃষ্টির লড়াই।
এই তুমুল অশান্তির মধ্যেই নীরবে এক মহিলা নিজের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গোটা জম্মু কাশ্মীরে ক্রিকেট ব্যাটের কারখানার একমাত্র মহিলা মালিক তিনিই। তিনি রিফাত, রিফাত জান মাসুদি। স্বপ্ন দেখেন একদিন তাঁর ব্যাট হাতেই ময়দানে নামবেন ভারতের ক্রিকেট তারকারা।
৩৮ বছরের রিফাতের গল্পটার শুরু ১৯৯৯ সালে। যখন সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী পাকিস্তানে গিয়েছিলেন বাসে চেপে। রিফাতের মনে আছে, “বাজপেয়ীর চেষ্টায় কাশ্মীরে অনেকটা শান্তি আর স্বাভাবিকতা এনে দিয়েছিল। কাশ্মীরে তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদাও বাকি দেশের কাছে বেড়ে গিয়েছিল।”
সত্তরের দশকেই রিফাতের শ্বশুর কাশ্মীরের উইলো কাঠ দিয়ে ব্যাট তৈরির কারখানা চালু করেছিলেন। নয়ের দশকে জঙ্গিসন্ত্রাস ফিরে আসতে মার খেতে শুরু করে ব্যবসা। বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। তাঁদের জায়গায় কপাল খুলে যায় জলন্ধরের ব্যাটের কারখানাগুলির।
রিফাতের বয়স তখন ২১। তিনিই ঠিক করেন, হাল ধরবেন। কাশ্মীরী ব্যাটের জন্য যেসব দেশি ক্রেতা আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাঁদের জনে জনে ফোন করে যোগাযোগ করতে শুরু করেন তিনি। পাইকারি ক্রেতারা এলে তাঁদের তাঁর মাসুদির বাড়িতে থাকারও প্রস্তাব দেন। বরাবর তাঁকে সাহস যুগিয়েছেন স্বামী শৌকত। তিনি বনবিভাগের কর্মী। ২০১০ সালে শৌকত সর্বসময়ের ফুটবল কোচ হয়ে যান। এখন তিনি ছোটদের ফুটবল শেখাচ্ছেন।
শ্রীনগরের উপকণ্ঠে সৌরায় তাঁদের মহল্লায় নিঃস্তব্ধতা ভেঙে দেয় রিফাতের কারখানা মাসুদি আর্টস অ্যান্ড স্পোর্টসের মেশিনের আওয়াজ আর শ্রমিকদের কথাবার্তার আওয়াজ। এখানে থেকেই দিল্লি আর মুম্বইয়ে ক্রিকেট ব্যাট যায় আন্তর্জাতিক আর দেশি টুর্নামেন্টের জন্য। কাশ্মীরে বিক্রি হয় সামান্যই। রিফাতে ছোট পুরানো দোতলা বাড়ির একতলায় কারখানা, বাকি ঘরে কাঁচামাল আর তৈরি ব্যাটে ভর্তি।
ব্যাঙ্কের কোনও সাহায্য নেননি। যেটুকু করেছেন, নিজেদের পরিশ্রমের টাকায়। মাসে ৩ থেকে ৫ হাজার ব্যাট তৈরি করতে পারে রিফাতের কারখানা। জিএসটি চালু হওয়ার পর অর্ডার খানিকটা কমেছে। ব্যাটে আগে কর ছিল না। এখন কর বসেছে ১২%। ফলে দামও বেড়েছে ব্যাটের। তবুও তাঁর বছরের মোট ব্যবসা ৫ কোটি টাকার মতো।
দুই সন্তানের মা রিফাত হাল না ছেড়ে অশান্ত কাশ্মীরে লড়ছেন আরেক লড়াই।