৫৪৭০৩ ক্যানসার প্যাসেঞ্জার ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসছে

0
414

সন্ধের একটু পরে পাঞ্জাবের ভাতিন্দা রেলস্টেশনে পৌঁছে গেলে এ দেশকে নতুন ভাবে চেনার একটা সুযোগ পেয়ে যাবেন। বা আরও নির্দিষ্ট করে বলে পাঞ্জাবকে। রাত ৯টায় ভাতিন্দার প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন ঢোকে। ৫৪৭০৩ অবোহার-যোধপুর প্যাসেঞ্জার। এরকম ট্রেন সারা দেশে একটাই। ট্রেনটার একটা ডাকনাম আছে। ক্যানসার ট্রেন। এ ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রীই ক্যানসারের রোগী। তাঁরা বিকানীরের একটি ক্যান্সার হাসপাতালে যান চিকিতসার জন্য। ভাতিন্দা পাঞ্জাবের মালওয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ভাতিন্দা, ফরিদকোট, মোগা, ফিরোজপুর, মুক্তসর, মানসা- এই কটি এলাকা নিয়ে মালওয়া অঞ্চল। মালওয়া অঞ্চলের কৃষক ও তাঁদের পরিবারের মানুষেরা ক্যানসারসহ বহু রকম অসুখের শিকার।

পাঞ্জাবের কৃষিক্ষেত্র বলতেই যে বিস্তীর্ণ সবুজ শস্যবহুল প্রান্তর চোখে পড়ে, তার সূচনা হয়েছিল কৃষিবিপ্লবের সময় থেকে। ৭-এর দশকের কৃষিবিপ্লব বদলে দিয়েছিল দেশের শস্য মানচিত্র। এই নয়া মানচিত্রের খেসারত দিচ্ছে মালওয়া, এমনটা মনে করেন বহু বিশেষজ্ঞ। পাঞ্জাবে ফসলের অতি ফলনের জন্য কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার ভয়াবহ রকমের বেশি। সারা দেশের কৃষকরা যেখানে গড়ে প্রতি হেক্টর জমিতে ৫৭০ গ্রাম কীটনাশক ব্যবহার করেন, সেখানে পাঞ্জাবে হেক্টর প্রতি কীটনাশকের ব্যবহার ৯২৩ গ্রাম। মালওয়া অঞ্চলে তুলার উতপাদনের জন্য অন্ততপক্ষে ১৫ রকমের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ৭ ধরনের কীটনাশককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের শরীরে ক্যানসারপ্রবণ কীটনাশক বলে ধরা হয়ে থাকে। রাসায়নিক সারের ব্যবহারও এ অঞ্চলে আকাশছোঁয়া। সারা দেশে যেখানে হেক্টরপ্রতি ১৩১ কিলোগ্রাম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সেখানে পাঞ্জাবে প্রতি হেক্টর জমিতে ব্যবহার করা হয় ৩৮০ কিলোগ্রাম রাসায়নিক সার। এলাকার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা একঅসঙ্গে জানাচ্ছেন সচেতনতার বিন্দুমাত্র বালাই না থাকায় কৃষকরা মারাত্মক কীটনাশকের খালি পাত্রগুলিকে জল ও খাবার রাখার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। ফলে কর্কটরোগ এ অঞ্চলে মারণথাবা ছড়াচ্ছে।
৫৪৭০৩ প্যাসেঞ্জার ভাতিন্দা স্টেশনে দাঁড়ায় আধ ঘন্টা। রাত সাড়ে নটায় ভাতিন্দা ছেড়ে এই সাধারণ প্যাসেঞ্জার ট্রেন বিকানীর পৌঁছয় পরদিন সকাল ৬টা ১০এ। ২৫ মিনিট পর ট্রেন চলে যায় পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। ওই পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ক্যানসার যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমে পড়েন। তাঁদের গন্তব্য আচার্য তুলসী রিজিওনাল ক্যানসার ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, সংক্ষেপে আর সি সি। মালওয়ার গরিব মানুষেরা ক্যানসার চিকিতসার জন্য এখানে আসেন, কারণ নিজেদের এলাকায় চিকিতসার ব্যয় বহন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক এক সরকারি সমীক্ষায় জানা গেছে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে ক্যানসারে মারা গেছেন ৩৩,৩১৮ জন, যাঁদের মধ্যে ১৪,৬৮২ জন ছিলেন মালওয়ার বাসিন্দা। এখন অনেক কৃষকই মনে করছেন, ৭-এর দশকে উচ্চ ফলনশীল বীজ-কীটনাশক-রাসায়নিক সার-জলের যে পদ্ধতির সূচনা হয়েছিল তারই দাম দিচ্ছে পাঞ্জাব।