ফিরে দেখা ২০১৮

0
82

১. আচ্ছে দিন?

আচ্ছে দিন আসবে। এই স্বপ্ন দেখেই ভারতের মানুষ দুহাত উজার করে ভোট দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদীকে। সেটা ২০১৪ সালের ঘটনা। এরপর পাঁচ বছর গড়িয়ে গেছে। অনেক সভা, কর্মসূচি, অনেক প্রতিশ্রুতি এসেছে। উন্নয়নের লম্বা তালিকা সভা থেকে সভান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালের শেষ প্রান্তে এসে, যখন দোরগড়ায় কড়া নাড়ছে আর এক নির্বাচন, সেই ভোটাররাই হিসেব করতে বসেছেন।

এই প্রশ্নে সবথেকে বেশি সরব হয়ে উঠবেন কৃষকরা। ২০১৮ সাল জুড়ে একের পর এক কৃষক বিক্ষোভ আছড়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ফসলের ন্যয্য মূল্য না পাওয়া, কৃষিঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ঋণের দায়ে আত্মঘাতী হওয়া, ফসল বিমা যোজনার টাকা না পাওয়া। একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে গোটা বছর জুড়ে। আচ্ছে দিন কোথায়, এই প্রশ্ন হয়তো করতেই পারেন ভারতের কৃষকরা।

২০১৮ সালে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি। ফলে নতুন করে কলকারখানা তৈরি হয়নি। মেহুল চোকসি, বিজয় মালিয়া কাণ্ডের জেরে ১১টি ব্যাঙ্ক মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেছে। তারফলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে নতুন করে বিনিয়োগ আসেনি। বিমুদ্রাকরণের জেরে অসংগঠিত ক্ষেত্রের টালমাটাল অবস্থা কাটেনি এ বছরও। ফলে কৃষির পাশাপাশি শিল্প ক্ষেত্রও আচ্ছে দিনের খোঁজে।

প্রথম তিন বছর সেভাবে বড় কোনও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রায় গোটা বছর ধরেই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে রাফাল লেনদেন নিয়ে রাহুলের অভিযোগ সামলাতে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যদিও বা স্বস্তি মিলেছিল, সেখানেও রায়ে সংশোধনী চেয়ে সরকারের হলফনামা আবার বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

তাহলে কি আচ্ছে দিনের পক্ষে বলার মত কিছুই নেই? পেট্রোল, ডিজেলের দাম আকাশ ছুঁয়েও আনেকটাই নেমে এসেছে। সৌজন্যে আন্তর্জাতিক বাজারের দর পতন। মুদ্রাস্ফীতির হার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। ভিত্তি বছরের পরিবর্তন করে জিডিপি বৃদ্ধির হার আবার সন্তোষজনক দেখাচ্ছে।

এইসব পাওয়া এবং না পাওয়াকে সামনে রেখেই ভারতের মানুষ হিসেব করতে বসেছেন বছরটা সত্যিই আচ্ছে গেল কিনা।

২. সংস্কার বনাম প্রগতি

এবছরটা যেন ধর্মস্থানে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নিয়ে লড়াইয়ের বছর। শনি সিগনাপুর মন্দির ও মুম্বয়ের হাজি আলি দরগায় মহিলাদের প্রবেশের অধিকারকে মাথায় রেখে এবছরের সেপ্টেম্বর মাসে ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের রায়ে শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরে দরজা খুলে যায় সব বয়সী মহিলাদের জন্য। এর আগে ১০-৫০ বছরের মহিলাদের ওই মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কেরলের ওই প্রাচীর আয়াপ্পার মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু শবরীমালা মন্দির নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে কেরলে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করে শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের অবাধ প্রবেশের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হয় কেরল সরকার। কিন্তু দফায় দফায় আয়াপ্পা মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথ আটকে দেন প্রতিবাদী ভক্তরা। এর পর একদিন অক্টোবরের মাঝামাঝিতে পুলিশের প্রহরায় তীব্র বিক্ষোভের মধ্যেই মন্দিরে প্রবেশের কাছাকাছি পৌঁছে যান দুই মহিলা। প্রবেশদ্বারের ১০০ মিটারের মধ্যে পৌঁছে যান তাঁরা। কিন্তু তখনই বাধা তুলে দেন আয়াপ্পা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। ঘোষণা করেন, মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোকার চেষ্টা করলে মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হবে। শবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেও মাঝপথে রণেভঙ্গ দেন সমাজকর্মী ত্রুপ্তি দেশাই। বিক্ষোভের মুখে পড়ে কোচি বিমানবন্দর থেকেই ফিরে যান। সমস্ত সরকারি প্রচেষ্টাই সার। সুপ্রিম রায়ের পর বেশ কয়েক মাস কেটে গেলেও সব বয়সী মহিলাদের মহিলাদের মন্দির দর্শনের অধিকার পূর্ণতা পায়নি। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পুনর্বিবেচনার জন্য একাধিক পিটিশনও দাখিল হয়ে যায় শীর্ষ আদালতে। যদিও বছরের শেষ দিকে শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করতে পেরেছেন ৪ রূপান্তরকামী।

৩. পাঁচের পাচালি

এমনিতে বিধানসভা নির্বাচন, জাতীয় রাজনীতির নিরিখে খুব একটা প্রভাব না ফেললেও এবারের নির্বাচনকে লোকসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। এই পাঁচটির মধ্যে হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য- মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থানে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। তেলঙ্গানায় চন্দ্রশেখর রাওয়ের টিআরএস এবং মিজোরামে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। ৪০ আসনের মিজোরামকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছিল বিজেপি। কারণ, সেখানে জিতলে উত্তর-পূর্বের ৭টি রাজ্যই তাদের দখলে আসত। গো-বলয়ে বিজেপির দখলে থাকা তিন রাজ্যে জিততে মরিয়া ছিল কংগ্রেস। গোবলয়ের তিন রাজ্যে মায়াবতীর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হওয়ার কথা চলছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময় কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দেন উত্তরপ্রদেশের বহেনজি। কংগ্রেসের আশায় জল ঢেলে দেন তিনি। ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের বদলে তাদের বহিষ্কৃত নেতা অজিত যোগীর হাত ধরলেন তিনি। রাফাল থেকে নোটবন্দি। সার্জিকাল স্ট্রাইক থেকে পরিবারতন্ত্র সবকিছুই উঠে আসে প্রচারে।
আর ভোটের ফলাফলের পরই মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা করে দিলেন মায়াবতী ও অখিলেশ। এমনকী রাজস্থানেও প্রয়োজনে সাহায্যের কথা জানিয়ে দিল তাঁরা। ফলে ৫ রাজ্যেই যে বিজেপি আসছে না সেই সম্ভাবনায় শিলমোহর পড়ে গেল সেইদিনই। তেলেঙ্গনায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন নির্ধারিত দিনেই। মধ্যপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রীর পদ পেলেন কমলনাথ। রাজস্থানে অশোক গেহলট পেলেন মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শি। ডেপুটি নিযুক্ত হলেন শচিন পাইলট। ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের তরফে মুখ্যমন্ত্রী হলেন ভূপেশ বাঘেল। মধ্যপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিয়েই দুঘণ্টার মধ্যে কৃষিঋণ মুকুবের ফাইলে সই করে দেন কমলনাথ। ক্ষমতায় ফিরলে ১০ দিনের মধ্যে কৃষি ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করেছিলেন রাহুল।

৪. ক্যাপ্টেনের নয়া ইনিংস

১৯৯২ সালে দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন । ২০১৮ সালে হাল ধরলেন দেশের। ২২ গজ থেকে পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ১৫৬ আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে তেহরিক-ই-ইনসাফ। ভোটের ফলপ্রকাশের পর অনেক টালবাহানা বিতর্কের পর ৩ সপ্তাহ অতিক্রান্ত। অবশেষে ১৮ আগস্ট, ২০১৮ শপথ নিলেন ইমরান খান। শপথ নেওয়ার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে পারবেন তো তিনি। প্রথমেই তাঁর নজরে ছিল কাশ্মীর সমস্যা। তিনি আলোচনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন ভারত সরকারের সঙ্গে । তবে তাঁর অভিযোগ দিল্লি সাড়া দেয়নি তাঁর আবেদনে। এরপরেই তিনি তোপ দাগেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও। টুইটে লেখেন, ভারতের সিদ্ধান্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ, এবং নেতিবাচক,তাঁদের সিদ্ধান্তে তিনি হতাশ। আগেও অনেক মানুষ দেখেছি যাঁরা ক্ষমতাশীল, কিন্তু দূরদর্শী নন।
এরপর ইমরানের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে আরও চিড় ধরে ভারতের। তবে ডিসেম্বর মাসে কর্তারপুর করিডরের মাধ্যমে খানিকটা শিথিল হয় দুই দেশের সম্পর্ক। কর্তারপুর করিডরের উদ্বোধন করেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তাতে অংশ নেন ভারতের দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। অংশ নেন প্রাক্তন ক্রিকেটার ও কংগ্রেসের মন্ত্রী নভজ্যোত সিং সিধু। ইমরান অবশ্য এক সাংবাদিক সম্মেলনে কাশ্মীর ইস্যুতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
সম্প্রতি অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ-এর প্রসঙ্গ টেনে এনে ভারতকে কটাক্ষে বিদ্ধ করেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সংখ্যালঘুদের কী ভাবে নিরাপত্তা দিতে হয়, তা ভারতকে দেখিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়েছিলেন তিনি। যদিও ভারতের বিষয়ে নাক না গলিয়ে ইমরানকে নিজের দেশ নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিলেন খোদ নাসিরুদ্দিনই।
অন্যদিকে এবছরই তৃতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ৬৬ বছরের ইমরান। যদিও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খান তাঁর লেখা বইয়ে ইমরানের অনেক বিতর্কিত তথ্য ফাঁস যা নিয়ে পাক রাজনীতি শোরগোল পড়ে যায়।

৫. জয় কিষাণ

২০১৮ সালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা বছরেই কৃষকদের ক্ষোভ, বঞ্চনা, প্রতিবাদ, আন্দোলন দেখল ভারতবর্ষ। মুম্বইয়ের আরব সাগর, রাজস্থানের মরুভূমি, তামিলনাড়ুর ভারত মহাসাগর রাজধানী দিল্লি সাক্ষী রয়েছে সেই সমস্ত কৃষক বিক্ষোভের। দীর্ঘ পথ হেঁটে শহরে এসে নিজেদের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। তাঁদের এই বর্তমান অবস্থার জানান দেওয়ার জন্যে, অর্ধনগ্ন প্রতিবাদে গোটা দেশকে লজ্জিত হওয়ার বার্তা দিয়েছেন কৃষকরা। অনেকেই বলছেন, যদি কোন একটা ইস্যু আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রভাব ফেলে, সেটি কৃষি সমস্যা। এই কারণেই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারে প্রায় প্রতিটি জনসভায় কৃষক সমস্যার কথা তুলে ধরেন রাহুল গান্ধি।
যে কৃষকরা ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন, দিনরাত এক করে পরিশ্রম করার পরেও যে কৃষকের দুবেলা ভরপেট খাবার জোটার নিশ্চয়তা নেই, যে কৃষকরা ভারতের ৮০ শতাংশ, সেই অগণিত কৃষককে শুধুই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন ভারতের শাসক এবং বিরোধী দলের নেতারা। তারই ফলশ্রুতিতে ঋণের দায়ে আজ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন অসংখ্য কৃষক, খালি পেটে থাকার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পুলিসের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছেন। এটাই কাঁটার মত বিধছে শাসক দলের কাছে। কৃষকদের আওয়াজ এতটাই জোরালো হয়ে উঠেছে যে, ক্ষমতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কৃষিঋণ ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করতে হয় কমলনাথ, অশোক গেহলট, ভুপেশ বাঘেলকে। কৃষক ভোট না পেলে ভোটে জেতা যাবে না, অতএব একই পথ বেছে নিতে হয় অসমের মুখ্যমন্ত্রীকেও। রাহুল গান্ধিকে টুইটে বলতে হয়, নরেন্দ্র মোদীর ঘুম ভাঙাবেন তাঁরা।