সাইকেলে চাঁদের পাহাড়

0
148

পাহাড়চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন বাঙালীর চিরকালের। সেই যখন রাধানাথ শিকদার মাপলেন মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা, তারও আগে থেকে পর্বতশিখরে নিজের কীর্তি স্থাপন করতে উদ্যোগী বঙ্গবাসী। সশরীরে না হোক, লেখনির মাধ্যমে উপন্যাসের নায়ককে পর্বত জয় করানোতেই যেন নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণ। আর তা থেকেই চাঁদের পাহাড় উপন্যাস। তবে, গল্পের নায়ক শঙ্কর গিয়েছিল দুর্গম পথ পার হয়ে, আর বাস্তবের শঙ্কর ওরফে উজ্জ্বল পাল গেলেন সাইকেলে চড়ে। প্রথম ভারতীয় হিসাবে সাইকেলে চাঁদের পাহাড়ে উঠলেন বীরভূমের এই বাসিন্দা। দিনটাও মনে রাখার মতো, ২৬ জানুয়ারি। সাধারণতন্ত্র দিবসের দিনেই আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমানজারোর মাথায় পৌঁছন তিনি। সকাল ছটায় তাঁর বাহন সাইকেল ‘চেতক’কে সঙ্গী করে কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ স্থান উহুরু শৃঙ্গে পৌঁছন তিনি।
পৃথিবীর সবথেকে পরিবেশ বান্ধব যান হল সাইকেল। তাই চিনের মতো দেশে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সাইকেলের উপর নির্ভরশীল। ভারতেও কম নয় সংখ্যাটা, প্রায় ৫০ কোটি। তাই এই সাইকেলকে সঙ্গী করেই ‘সবুজ বাঁচাও’ অভিযানে বেরিয়ে পড়েন উজ্জ্বল পাল। নিজের বাহনের একটা যুতসই নামও দিয়েছেন তিনি, ‘চেতক’।
এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চেতকে চেপে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘গ্রিন অন হুইল’-এর বার্তা ছড়ান উজ্জ্বল। শুরু ২০১১ সালে সুন্দরবন বাঁচাও অভিযান নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রার পর থেকে। সেবারও তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও তিন বন্ধু। এরপর সাইকেলকে সঙ্গী করেই একাই পাড়ি দিয়েছেন সাত সমুদ্র, তেরো নদী। এই যাত্রার আগে তিনি ঘুরে নিয়েছেন বিশ্বের বারোটা দেশ। প্রতিটি দেশে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন ‘সবুজ বাঁচাও’-এর বার্তা।
ভারতে দু বছরের বেশি সময়ই সাইকেলে করে ঘুরেছেন ২২ হাজার কিলোমিটার। ইউরোপের তুরস্ক, গ্রিসের মতো কয়েকটি দেশ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ, আন্দামান, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সাইকেলে চেপে ঘুরে এসেছেন সবুজের বার্তা নিয়ে। তিনি জানান, বন্ধুদের সাহায্যে বিদেশযাত্রা করেন তিনি। এবার যুব কল্যাণ দফতর থেকে সামান্য কিছু সাহায্য মিলেছে। তবে, উজ্জ্বলের কথায়, রাস্তার খরচ রাস্তাতেই মিলে যায়। কখনও স্কুলের মিড ডে মিলে খাবার খেয়ে, কখনও কারও বাড়িতে আবার কখনও পুলিস স্টেশনে আশ্রয় নিয়ে পথ পেরিয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে কাগজে ছবি এঁকে বা গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে সকলকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁর চাহিদা। তবে প্রাথমিক প্রয়োজন যেমন খাবার, জল, জিনিসের দাম এগুলির বিষয়ে বর্ডারে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ভাষার সাথে পরিচিত হয়ে যান তিনি।
এতগুলি দেশ, এত বিপুল কিলোমিটার সাইকেলে করে যাত্রা করে আসার পরেও তিনি থেমে থাকেননি, থেমে থাকতে চান না এই বঙ্গসন্তান। গত ২০১৮-র ২৭ অক্টোবর তাঁকে হাতছানি দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। মিশরের রাজধানী থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ হয় চাঁদের পাহাড়ে। কিলিমানজারোর উচ্চতম চূড়ায় দাঁড়িয়ে ৭০তম সাধারণতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা ওড়ালেন তিনি। উজ্জ্বলের কীর্তি ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়েছে রাজ্য তথা দেশবাসীর।