৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪

0
108

আশিস ঘোষ

১৯৮৪। ৩১ অক্টোবর নিহত হলেন ইন্দিরা গান্ধি। ঠিক সেসময় রাজীব গান্ধি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সফরে। তখন তিনি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। বলতে গেলে শিক্ষানবিশী। একইরকম ভাষণ মুখস্থের মতো বলে চলেছেন সর্বত্র। সফর ছিল চারদিনের। আমি পুরুলিয়া থেকে রাজীবের ট্রেনে উঠলাম অন্য কাগজের আরও সহকর্মীদের সঙ্গে। সেই রাতে ট্রেনে, গাড়িতে করে পৌঁছলাম দিঘায়। রাজীবের সঙ্গেই।
পরদিন সকালে দিঘা থেকে কলকাতা ফিরে দিল্লি যাওয়ার কথা তাঁর। গাড়ির বহর ছিল বেশ লম্বা। একটা অ্যাম্বাসাডরে আমরা জনা চারেক রিপোর্টার, ফটোগ্রাফারদের গাড়ি আলাদা। প্রথমে পুলিশের একটা পাইলট জিপ। তারপরে রাজীবের গাড়ি। তারপরের দুটো গাড়িতে প্রণব মুখোপাধ্যায়, গনিখান চৌধুরী, প্রদেশ কংগ্রেসের কেষ্টবিষ্টুরা। পাঁচ কি ছয় নম্বর গাড়িতে আমরা, রিপোর্টাররা। দিঘা ছাড়িয়ে রাস্তার পাশে ছোট জনসভা। তারপর কাঁথি স্টেডিয়াম। বিস্তর লোক। পরের সভা মহিষাদলে।
খানিকটা এগোতেই হেড়িয়ার কাছ হঠাৎই থেমে গেল কনভয়। কী হয়েছে বুঝতে পারছি না কেউই। দেখলাম সামনের দিক থেকে এক পুলিস অফিসার দৌড়ে যাচ্ছেন পিছনের দিকে। ওয়াকিটকিতে বলতে বলতে যাচ্ছেন, অ্যাকসিডেন্ট ইন দ্য হাউস। সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্টারের অ্যান্টেনা খাড়া। পিছনে ফটোগ্রাফারদের গাড়ি থেকে কী মনে করে আমাদের ফটোগ্রাফার তপন দাসকে তুলে নিলাম আমাদের গাড়িতে। মন বলছিল, কিছু একটা হয়েছে দিল্লিতে। অন্যদের সতর্ক করে ড্রাইভারকে বললাম, যত তাড়াতাড়ি পারেন গাড়ি চালান। তিনিও জোরে চালিয়ে গাড়ি নিয়ে এলেন কনভয়ের তিন নম্বরে। এবার স্পষ্ট হল অনেকটা।
আবার থামল গাড়ি। দৌড়ে নামলাম আমরাও। একটা গাড়িতে হেলান দিয়ে ছোট একটা ট্রানজিস্টারে রাজীব শুনছেন বিবিসির খবর। পাশে দাঁড়িয়ে শুনছি আমরাও। ছবি তুলে নিল তপনদা। সরকারিভাবে আকাশবাণীতে ঘোষণা না হলেও বিবিসি জানাচ্ছে সবই। ইন্দিরার গায়ে গুলি লেগেছে। তাঁকে এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আর নেই। রাজীব বললেন, “আমাদের দুটো বাড়িতে মাঝখানে একটা গেট আছে। সেখানে পাহারা দেয় দুই শিখ জওয়ান। আই কশানড মাম্মি সো মেনি টাইমস। কতবার যে মাম্মিকে সাবধান করেছিলাম!”
ততক্ষণে খবর এসেছে, হেলিকপ্টারে রাজীব সোজা উড়ে যাবেন দমদম এয়ারপোর্টে। এবার স্পিড বেড়ে গেল কনভয়ের। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা মঞ্চ সাজিয়ে ফুল আর মালা হাতে দাঁড়িয়ে। কোথাও না থেমে ঝড়ের গতিতে ছুটছে গোটা কনভয়। পাল্টে যাচ্ছে দুপাশে মোড়ে মোড়ে লাগানো মাইকে স্লোগান। স্লোগান পাল্টে যাচ্ছে, ‘রাজীব গান্ধি জিন্দাবাদ ‘ থেকে ‘ইন্দিরা গান্ধি অমর রহে।’ পৌঁছলাম কোলাঘাটের আইওসি গ্রাউন্ডে। সেই হেলিকপ্টারে উঠলেন প্রণববাবু, গনিখান চৌধুরী। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হলেন রাজীব।