এক সেনাকর্তার আক্ষেপ

0
63

২০০২ সালের গুজরাতের দাঙ্গা কী রাজ্য সরকারেরই ব্যর্থতা? প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্যই কী এত মানুষের প্রাণহাণি হয়েছিল? নতুন করে আবার সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জামিরউদ্দিন শাহের মুখ খোলার পরেই নতুন করে দানা বেঁধেছে বিতর্ক।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুজরাত জুড়ে মোতায়েন করা হয়েছিল সেনাবাহিনীকে। সেই দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন তিনিও। এই নিয়ে কদিন আগেই মুখ খুলেছিলেন জমির শাহ। নতুন করে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও সেই একই দাবি করেন তিনি। তাঁর আক্ষেপ, কমপক্ষে আরও ৩০০ জন লোককে বাঁচাতে পারতাম। ২০০২ সালের পয়লা মার্চ। ৩ হাজার সেনা আমেদাবাদে এয়ারপোর্টে পৌঁছায় এক তারিখ সকাল সাতটায়। সেই থেকে টানা ৩৪ ঘন্টা ঠায় তাঁরা সেখানে বসে।
দাঙ্গা তার আগের দিনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সকালে এয়ারপোর্টে বসে বসে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু নিধিরাম সর্দার হয়ে বসে রয়েছি। পুরোটাই প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনওরকম গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়নি আমাদের জন্য। না গাড়ি, না রসদ, না রুট ম্যাপ। তাঁর আগে এক তারিখ রাত দুটোই সরাসরি সাক্ষাত করি মুখ্যমন্ত্রী মোদির বাসভবনে। ভাগ্য ভালো, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সবে নৈশাহারে বসেছেন। তাঁরা আমায়ে দেখে যথেষ্ট আশ্বস্ত হলেন। নৈশাহারে যোগ দিতে বলা হয়। আমি যোগও দিই। দ্রুত প্রসঙ্গে আসি। বলি, সৈন্যরা আসছে। দ্রুত আক্রান্ত এরিয়ার ম্যাপ, ট্রাক, রাস্তা চেনানোর জন্য পুলিশ প্রভৃতি দাবি লিস্ট আকারে জমা দেই। তাঁরা আমাকে আশ্বস্ত করেন। অবিলম্বে সেগুলোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান।
সকাল সাতটায় আমি আমার সেনাদের সঙ্গে এয়ারপোর্টে যোগ দেই। শেষ পর্যন্ত সবই এল। কিন্তু অনেক দেরি করে। এরমধ্যে পেরিয়ে গেছে অনেক মূল্যবান সময়। যেখানে রাজ্যের মুখ্যসচিবের উচিত ছিল, শহরের কোথায় অবস্থান নিতে হবে, গোটা গুজরাতের আক্রান্ত অঞ্চলে দ্রুত আর্মি পৌঁছানোর লজিস্টিকাল সাপোর্টের ব্যবস্থা করা। সময়মতো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির সমালোচনা করেন তিনি। সরাসরি তাদের রিপোর্টের কিছু অংশকে ডাহা মিথ্যা বলেও দাবি করেন। বিশেষ করে সেনা মোতায়েন নিয়ে। সেই রিপোর্টে বলা ২৮ তারিখে আর্মি ডাকা হয়। কিন্তু সময়মতো তাঁরা পৌছায়নি আমেদাবাদে। সেনাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা ১ তারিখ আড়াইটের মধ্যেই করা হয়। এটা একেবারেই ঠিক নয়।
সেই রিপোর্টে শুধু এটুকুই সুনিশ্চিত করা হয়েছে, দাঙ্গার পিছনে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও ষড়যন্ত্র ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী যথেষ্ট তৎপরতা দেখিয়েছেন। এটাও বলা হয় রিপোর্টে। প্রায় ১,০৪৪ জন মানুষ প্রাণ হারান ৩ দিনে। একটা দিনের মৃত্যু কমানো যেত। চেষ্টা করলে হয়তো আরও ৩০০ প্রাণ বাঁচানো যেত। সেই আক্ষেপ এখনও মিটছে না তাঁর।
তিনি আরও বলেন, আমি বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। পুলিশের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলাম। প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা মত দিচ্ছিলেন। ঠিক কী হয়েছে, কেন দাঙ্গা এটাও জানত না অনেকে। যেটা জানতে পারি, করসেবকদের মৃতদেহ গোধরা থেকে আমেদাবাদ নিয়ে এলেই গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে। কেন আনা হল জানি না, তবে না আনা হলে বোধ হয় জনতা এত উত্তেজিত হয়ে পড়ত না। শুধু সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার মাশুল গুনতে হল।