স্বদেশি পুজোর শতবর্ষ

0
28

শতবর্ষের দোরগোড়ায় বাগবাজার সর্বজনীন। সেই ১৮১৯ সালে নেবুতলা বারোয়ারি দুর্গাপুজো দিয়ে শুরু। তারপর একশো বছরে নানা জায়গা পাল্টে আজ এখনকার পাকা ঠিকানায় থিতু হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্যের এই পুজো। তার আগে দুর্গাপুজ হত কেবল বনেদি জমিদার বাড়িতেই। সাধারণের তাতে না ছিল অংশগ্রহণ, না ছিল প্রবেশাধিকার। বঞ্চনার এই বোধ থেকেই ১২ জন মিলে বারোয়ারির চিন্তা। শুরু হয় নেবুতলা বারোয়ারি। সেইসময়, ১৮১৯ সালে এমন একটা পদক্ষেপ শুধুমাত্র উৎসবই নয়, ছিল সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এমনকি, শোনা যায়, ব্রাহ্মণদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁরা পুরোহিত না হন। তখন এগিয়ে এসেছিলেন এক ব্রাহ্মণ।

এই বারোয়ারির প্রথম পর্ব ১৯১৯ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত। প্রথমে ৫৫, বাগবাজার স্ট্রিটের সরকার বাড়িতে হত এই পুজো। নেবুবাগান সেন আর বাগবাজারের মোড়ের এই ঠিকানায় আত্মপ্রকাশ বাগবাজার বারোয়ারির। নাম নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গাপূজা। পরের তিনবছর এখানেই হয়েছিল বারোয়ারি পুজো। ১৯২৪ সালে পুজো সরে যায় বাগবাজার আর পশুপতি বোস লেনের মোড়ে। তারপরের বছর কাঁটাপুকুরে। ১৯২৭ সালে বাগবাজার কালীমন্দিরে। তবে বারোয়ারি সম্পূর্ণ আদল পায় সমাজকর্মী নগেন্দ্রনাথ ঘোষালের হাত ধরে। তিনি আরও অনেক বিশিষ্টকে টেনে আনেন পুজোয়। ১৯২৬ সালে পুজোর নামকরণও করেন তিনি — বাগবাজার সর্বজনীন।

১৯২৯ সালে পুজো উপলক্ষে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছিল। কলকাতা পুরসভার অল্ডারম্যান দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩০ সালে কমিটির সভাপতি হন। তাঁরই উদ্যোগে প্রদর্শনী হয়ে ওঠে স্বদেশি। কমিটির নাম হয় বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী। স্বদেশ শিল্প প্রদর্শনীর বড় জায়গার জন্য তিনিই বাছেন মেটাল ইয়ার্ডকে, এখন যেখানে পুজো হয়, সেই মাঠে। অনুমতির জন্য তিনি লেখেন সেসময়ের মেয়র সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে। তিনি শুধু সম্মতিই দেননি, প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিল পুরসভাও। পাঁচশো টাকা চাঁদাও দিয়েছিলেন নেতাজি। ১৯৩৮ সালে নেতাজি ছিলেন পুজোর সভাপতি। ১৯৩৬ সালে বীরাষ্টমীর লাঠিখেলায় উপস্থিত ছিলেন নেতাজি। তিনি দুর্গাপুজোকে দেশমাতৃকার পুজোর সঙ্গে তুলনা করে উদ্দীপ্ত করেন সবাইকে।

সন্তোষকুমার বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যার হরিশঙ্কর পালের মতো মানুষজন জড়িত ছিলেন পুজোয়। সেই থেকে আজও বাগবাজারের পুজো মানেই অন্য ইতিহাস। ব্রিটিশ অসুরের সঙ্গে স্বদেশিদের লড়াইয়ের প্রতীক। আজও বীরাষ্টমীতে লাঠিখেলা হয়, যার সূচনা হয় অনুশীলন সমিতির পুলিশ দাসের হাত ধরে। দশমীর সকালে বাগবাজারের সিঁদুর খেলা দেখতে লোকে ভিড় জমান এখানে।

আজও আশ্বিনের শুক্লা পঞ্চমীতে সূচনা হয় পুজোর। শেষ হয় লক্ষ্মীর বিসর্জনে। মৃৎশিল্পী নীলাঞ্জন পালের হাত ধরে আরম্ভ বাগবাজারের দেবী প্রতিমার। তারপর তাঁর ছেলে কার্তিক পাল, সাধন পালেরা ধরে রেখেছেন ট্রাডিশন। সেই ডাকের সাজ, সেই ভুবনভোলানো ত্রিনয়ন, দেবীর অভয়মুদ্রা।