এমন বন্ধু আর কে আছে, তোমার মতো সিস্টার? জনপ্রিয় একটি গানের কথাগুলো যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে সুচিত্রা রায়ের জীবনের সঙ্গে। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে দীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মজীবন শেষে বাঁকুড়ার হীড়বাঁধ ব্লকের মশিয়াড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে অবসর নিয়েছেন ষাটোর্দ্ধা সুচিত্রা রায়। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে নার্সিং ট্রেনিং করেন সুচিত্রা। ট্রেনিং শেষে ১৯৮৩ সালে জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন সরকারী স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন সুচিত্রা রায়। তারপর থেকে এখানেই সাফল্যের সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি কাজ করেছেন, বলা ভালো এখনও করে চলেছেন। রবিবার বা সরকারী ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সকালেই অভ্যাস মতো গ্রামের বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে তিনি পৌঁছে যান মশিয়াড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। তারপর বিরামহীনভাবে চলতে থাকে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার কাজ। বলতে গেলে এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি তাঁর হাতেই তৈরি। তাই অবসরগ্রহণের পর একদিনও বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি সকলেই প্রিয় সুচিত্রা পিসি। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে হাসপাতালে। নেই উপযুক্ত পরিকাঠামো। বহুদিন পূরণ হয়নি শূণ্যপদও। তাই সরকারিভাবে অবসর গ্রহণের পরও স্বেচ্ছায় বিনা পারিশ্রমিকে মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন সকলের প্রিয় ‘সুচিত্রা পিসি’।


প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে জেলা শহরে গিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ নিতে পারেন না এই এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। এই এলাকার ১০-১২টি গ্রামের অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষের কাছে তাই মশিয়াড়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রই ভরসা। তাঁদের সবার জন্য সব সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বসে আছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, সরকারীভাবে ‘অবসরপ্রাপ্ত’ নার্স সুচিত্রা পিসি। তাই অবসরের পরেও সুচিত্রা পিসিকে পেয়ে খুশী সবাই। গ্রামবাসী শ্রীজীব রায়ের কথায়, আমরা ওনাকে পিসি বলেই ডাকি। অবসরের পরেও নিয়ম করে গ্রামের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসেন। একই সঙ্গে অত্যন্ত যত্নসহকারে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে থাকেন বলে তিনি জানান। প্রসুতি মা থেকে শুরু করে সদ্যজাত শিশু। আবার সাধারণ মানুষের চোট আঘাত থেকে পেটের ব্যামোর চিকিৎসায় তিনিই ভরসা বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসীরা। সুচিত্রাদেবীর কথায়, এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি আমার নিজের হাতে গড়া। প্রায় শুরুর দিন থেকেই এখানে আছি। তাই অবসরগ্রহণের পর একদিনও বাড়িতে বসে থাকতে পারিনি। সর্বক্ষণ মন এখানেই পড়ে থাকে। তাই কোনও কিছু পাওয়ার আশা না করেই সকলের ভালোবাসার টানে তিনি এখানে ছুটে আসি। বিশ্ব নারী দিবসে সুচিত্রা রায়ের মতো মহিয়সীদের সম্মান জানাতে উদ্যোগী এলাকার মানুষও।